নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ-

২১ জানুয়ারি ২০২৬—বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা–২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অনুমোদনের পথে এগোতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। আজ বুধবার নারায়ণগঞ্জে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে এই পরিকল্পনাকে জনস্বার্থবিরোধী, অস্বচ্ছ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতকে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ‘গ্রিন গ্রিড’-এ রূপান্তরের আহ্বান জানান বক্তারা।

বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি (ESADS) ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সহ-আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে পরিবেশবিদ, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা জনগণকে পাশ কাটিয়ে প্রণয়ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কর্মসূচিতে অভিযোগ করা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) কোনো গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তৈরি করা হয়েছে। জনশুনানি, উন্মুক্ত পরামর্শ কিংবা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অর্থবহ নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলেন বক্তারা।

পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি (ESADS)-এর চেয়ারম্যান মো. হোসেন বলেন, জ্বালানি পরিকল্পনা কেবল প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ জনগণকে বাদ দিয়ে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।

বক্তারা আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে তারা একটি ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে চাইছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা জোরালোভাবে বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বলে দাবি করেন বক্তারা। পরিকল্পনায় কাগজে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ, কিন্তু প্রকৃত ও কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি মাত্র ১৭ শতাংশ। বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বক্তাদের মতে, ২৫ বছর পরও যদি এলএনজি, কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্ভরশীল থাকে, তবে তা জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ খাত আরও অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

প্রতিবাদকারীরা হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে তুলে ধরার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। তাঁদের মতে, এসব প্রযুক্তি এখনো উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়। এতে ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে পড়তে হতে পারে।

বক্তারা জানান, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ দাঁড়াবে প্রায় ১৮৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন CO₂e, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) লক্ষ্য ও জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গেও সরাসরি বিরোধী।

এ ছাড়া মহাপরিকল্পনায় শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলো প্রায় উপেক্ষিত থাকার অভিযোগ ওঠে। বক্তারা বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক দিক বিবেচনা ছাড়া কোনো জ্বালানি রূপান্তর টেকসই হতে পারে না।

প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ইপিএসএমপি ২০২৫ স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরুর আহ্বান জানানো হয়। তাঁদের দাবি, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে বাস্তবসম্মত ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর গ্রিন গ্রিডের রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

বক্তারা সতর্ক করে বলেন, এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে এই মহাপরিকল্পনা দেশের ইতিহাসে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নথি হিসেবে চিহ্নিত হবে—যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।