তরিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। মোট ২১০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৭টিই গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে সোনারগাঁ উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি উদ্বেগজনক। ১৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৯টিকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে। অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ অংশে ৬৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ৬৩টি কেন্দ্রকে সাধারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, ভোটার সংখ্যা, থানা থেকে দূরত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্গম ও চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—লাল (অতি ঝুঁকিপূর্ণ), হলুদ (ঝুঁকিপূর্ণ) ও সবুজ (সাধারণ)।
নিরাপত্তা জোরদারে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের কাছে থাকবে অস্ত্র ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা। প্রতিটি কেন্দ্রে ১৩ জন করে আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া মোবাইল টিম, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা মাঠে থাকবেন। চরাঞ্চলের নুনেরটেকের দুটি এবং চরকিশোরগঞ্জ-চরহোগলার তিনটি কেন্দ্র অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে স্ট্রাইকিং ফোর্স ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-অঞ্চল) মো. ইমরান আহম্মেদ জানিয়েছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে।
এদিকে নির্বাচন ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ব্যালট পেপার ও বাক্স কখন কেন্দ্রে পাঠানো হবে। দীর্ঘদিন ধরে ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপার ও বাক্স কেন্দ্রে পাঠানোর প্রচলন রয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আগের রাতেই অনেক কেন্দ্রে অস্থিরতা, দখলচেষ্টা, সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও ব্যালট বাক্স ছিনতাই, রাতেই ব্যালটে সিল মারা বা ভোরের আগে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের রাতে ব্যালট সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছালে ঝুঁকি বাড়ে। প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরো রাত চাপে থাকতে হয়। এতে গুজব, অবিশ্বাস ও অস্বচ্ছতার সুযোগ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় অনেকেই প্রস্তাব করছেন, ব্যালট পেপার ও বাক্স ভোটের দিন সকালে উপজেলা প্রশাসনের হেফাজত থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কেন্দ্রে পাঠানো হোক। তাদের মতে, এতে দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট হবে, অনিয়মের আশঙ্কা কমবে এবং ভোটারদের আস্থা বাড়বে।
জানা গেছে, বুধবার দুপুরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের কেন্দ্রে ব্যালট সামগ্রী পাঠানো শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করছে, এগুলো আগের দিন না পাঠিয়ে ভোটের দিন সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পৌঁছে দিলে ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রস্তুতির স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নবিদ্ধ প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের জন্ম দিতে পারে, যার প্রভাব পড়ে জনগণ, রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের ওপর।
ভোটারদের প্রত্যাশা, দিনের ভোট দিনের আলোতেই সম্পন্ন হবে—এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা। ব্যালট পেপার ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রে পাঠানো হলে নির্বাচনকে আরও ঝুঁকিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনআস্থাভিত্তিক করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়।