তরিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

১৪ নং ওয়ার্ড জাসাস এর যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হারুন অর রশিদ,বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতির নির্মম সত্য হলো, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন, তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না। দুঃসময়ে যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়ান, সুসময়ে এলে তাদের আড়ালে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। অথবা তারা নিজেরাই আড়ালে সরে যেতে বাধ্য হন। নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক ‘শহীদ জিয়া হল’কে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা এই নির্মম সত্যটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

জিয়া হল শুধু একটি ভবন নয়। এটি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অংশ। কয়েক দশক ধরে অসংখ্য রাজনৈতিক সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের সাক্ষী এই স্থাপনাটি। ফলে জিয়া হল নিয়ে আলোচনা মানে শুধু একটি ভবনের নাম নিয়ে আলোচনা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। এই উত্তরাধিকার রক্ষার কঠিন লড়াইয়ের প্রসঙ্গ এলেই যে নামটি অবধারিতভাবে সামনে আসে, তিনি আনিসুল ইসলাম সানি।

আজ অনেকেই জিয়া হল নিয়ে কথা বলছেন, তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না কিংবা বলতে আগ্রহী নন যে হলটির অস্তিত্ব, নাম এবং আইনি স্বীকৃতি রক্ষার পেছনে দীর্ঘ সময় ধরে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন সানি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের কিছু তথ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জিয়া হলের জমি ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা যখন প্রকট আকার ধারণ করে, তখন বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রয়োজন ছিল আইনি লড়াইয়ের। সেই কঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৎকালীন নেতা আনিসুল ইসলাম সানি।

তিনি বাদী হয়ে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। মামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল জমি-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি এবং স্থাপনাটিকে আইনিভাবে ‘শহীদ জিয়া হল’ হিসেবে বহাল রাখা। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সময়সাপেক্ষ আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে ‘শহীদ জিয়া হল’ নামটি আইনি স্বীকৃতি লাভ করে।

রাজনৈতিক বক্তব্য অনেকেই দিতে পারেন, মিছিলও অনেকেই করতে পারেন, কিন্তু আদালতের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও অস্তিত্বকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ সবাই নেয় না। একদিকে এই লড়াই দীর্ঘ, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে হওয়ায় তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানেই সানির অবদানের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ এই আইনি রায়ের শক্ত ভিত্তির ফলেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার চাইলেও জিয়া হলের নাম পরিবর্তন করতে পারেনি।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, বিভাগীয় শহর থেকে জেলা, জেলা থেকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নামকরণ করা হয়েছিল। সেই বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা জিয়া হলের নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা হয়েছে বারবার। কিন্তু নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কারণ এখানে ছিল আদালতের দেওয়া একটি সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি। সেই ভিত্তি নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আনিসুল ইসলাম সানি।

উল্লেখ করার মতো আরেকটি বিষয় হলো, তিনি এই লড়াই করেছেন এমন এক সময়ে, যখন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাও অনেকের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। তখন অনেকেই নীরব ছিলেন, কেউ কেউ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন দূর থেকে। আবার এমন অভিযোগও রয়েছে যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে কেউ কেউ নাম পরিবর্তনের পক্ষের শক্তির সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজেছিলেন। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জীবনের প্রতি ঝুঁকিও ছিল। সেই কঠিন সময়ে সানি আলোচনার আলোয় ছিলেন না, সংবাদ শিরোনামেও ছিলেন না। কিন্তু আদালতে, নথিতে এবং সাংগঠনিক যোগাযোগে তিনি নিজের কাজটি করে গেছেন।

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে আনিসুল ইসলাম সানি একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক পরিচয় ও মতপার্থক্য থাকলেও এই মূল্যায়ন নিয়ে দ্বিমত নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাকে ঘিরে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড কিংবা বিতর্কিত কোনো ঘটনার অভিযোগ নাই। একজন সক্রিয় ও দূরদর্শী নেতা কেবল অতীতের অর্জন আগলে রাখেন না; ভবিষ্যতের পথরেখাও নির্মাণ করেন, সানিও সেটাই করছেন।

জিয়া হলের নাম ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়েও ভাবছেন। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে শুধু অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তার প্রস্তাবিত ‘শহীদ জিয়া হল কমপ্লেক্স’ সেই ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন। আধুনিক অডিটোরিয়াম, পর্যাপ্ত কার পার্কিং, আর্ট গ্যালারি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্নত অবকাঠামো এবং বহুমাত্রিক নাগরিক সুবিধাসমৃদ্ধ একটি কমপ্লেক্স নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে এই উদ্যোগ। জিয়া হলকে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক ও নাগরিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমর্থন নিয়ে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, আজ কেন আনিসুল ইসলাম সানির অবদান নিয়ে আলাদা করে কথা বলার প্রয়োজন হলো। উত্তরটি খুবই সরল। ইতিহাস ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা অসুবিধার ভিত্তিতে লেখা হয় না; ইতিহাস লেখা হয় তথ্য, দলিল ও ঘটনার ভিত্তিতে। জিয়া হলের ইতিহাস লিখতে গেলে আদালতের সেই মামলার কথা আসবে, আইনি স্বীকৃতির প্রসঙ্গ আসবে, নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কথা আসবে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও আসবে। আর সেই প্রতিটি অধ্যায়ে আনিসুল ইসলাম সানির নাম অবধারিতবাবেই আসবে।

কোনো ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করা মানেই তাকে মহিমান্বিত করা নয়, বরং তার প্রকৃত অবদানকে স্বীকার করা। জিয়া হলের ইতিহাসে সানির ভূমিকা ও অবদানকে উপেক্ষা করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। কারণ কিছু মানুষ আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন, আর কিছু মানুষ আলোচনা ও নাম যশের প্রতি মোহের পরিবর্তে আড়ালে থেকে ভিত্তি নির্মাণ করেন। জিয়া হলের ক্ষেত্রে আনিসুল ইসলাম সানি সেই মানুষদেরই একজন। শুধু জিয়া হল নয়, নারায়ণগঞ্জের পরিচ্ছন্ন ও জনঘনিষ্ঠ রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশেও তার অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে নথিবদ্ধ ও মূল্যায়িত হতে হবে। এটা আশাবাদ বা দাবি নয়, এটা ইতিহাস ও সত্যের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।