চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তত সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অধীনে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এসব তথ্য জানান। পরে এ বিষয়ে একটি অফিস আদেশও জারি করা হয়।

জেলা প্রশাসন জানায়, গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে রয়েছে। এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।

দুর্গত মানুষের সহায়তায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। প্রথম দফার ত্রাণ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বরাদ্দও দ্রুত বিতরণ করা হবে।

উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারে সাতকানিয়া উপজেলার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় প্রায় আট হাজার মানুষ ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো দুর্গত মানুষ খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।

এদিকে জেলা প্রশাসন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, রেড ক্রিসেন্ট, ইপসা, আনসার বাহিনী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমন্বয়ে পৃথক উদ্ধার ও ত্রাণ দল গঠন করে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবন। কোনো প্রাণ যেন সামান্য অসচেতনতার কারণেও ঝরে না পড়ে। সবাইকে অনুরোধ করব, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসুন।”

তিনি জানান, সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।” এ সময় তিনি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।