
তরিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
বন্দরে ইটভাটার দাপটে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়। একসময় যে বিস্তীর্ণ জনপদে সবুজের সমারোহ ছিল, আজ সেখানে হাঁ করে তাকিয়ে আছে বিশালাকার গর্ত। ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীবেষ্টিত নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা একসময় ছিল সবুজে ঘেরা উর্বর জনপদ। কিন্তু ইটভাটার সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত একর আবাদি জমি। অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমির মাটি কাটার ফলে শুধু কৃষিজমিই কমছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তাঘাট, হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশের ভারসাম্য ও জনপদের অস্তিত্ব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলাজুড়ে বর্তমানে ২৬৪টি ইটভাটা সচল রয়েছে। এসব ভাটায় প্রতিবছর ইট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ১৮ কোটি ৪৮ লাখ ঘনফুট মাটি। এর মধ্যে শুধু বন্দর উপজেলাতেই রয়েছে ৪৪টি ইটভাটা। এখানকার প্রতিটি ভাটায় বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ ইট উৎপাদিত হয়, যা জেলার অন্যান্য এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ফলে কেবল বন্দর উপজেলাতেই বছরে প্রায় তিন কোটি আট লাখ ঘনফুট মাটির প্রয়োজন পড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য অঞ্চলের ইটভাটাগুলো সাধারণত ফরিদপুর, মাদারীপুর বা শরীয়তপুরের নদীসংলগ্ন অঞ্চল থেকে পলিমাটি সংগ্রহ করে। নদীপথের সেই পলিমাটি বর্ষা মৌসুমে আবার পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু বন্দর উপজেলার পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানকার অধিকাংশ ইটভাটা মাটির জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে স্থানীয় কৃষিজমির ওপর।
বন্দর উপজেলার ধামগর ইউনিয়নের জাঙ্গাইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। মাটি ব্যবসায়ীরা প্রথমে কৌশলে কোনো কৃষকের কাছ থেকে একটি জমি ক্রয় করেন। পরে সেই জমি ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীর করে খনন করে মাটি নিয়ে যান। এতে পাশের জমিগুলোর পার ভেঙে পড়ে এবং সেগুলো চাষাবাদ বা বসতবাড়ি নির্মাণের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে আশপাশের জমির মালিকরা নিরুপায় হয়ে নামমাত্র মূল্যে তাঁদের জমি ইটভাটা মালিক বা মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এভাবে শত শত একর জমি বিশাল গর্তে পরিণত হচ্ছে।
এছাড়া সরকারি সড়কের পাশ থেকেও গভীর করে মাটি কাটার কারণে উপজেলার বারপাড়া গ্রামে রাস্তা ধসে পড়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
কৃষিজমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল। স্থানীয় কৃষক আবুল কাশেম বলেন, “আগে আমার এই ক্ষেত থেকে প্রতিদিন শতাধিক লাউ তুলতাম। এখন পুরো ক্ষেত খুঁজলেও চার-পাঁচটির বেশি পাওয়া যায় না। ধোঁয়া আর দূষণে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে।”
এদিকে মাটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্থানীয়দের প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নে এমন এক সংঘর্ষে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন আহত হন।
বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার বলেন, “কৃষিজমি নষ্ট করে যারা মাটি কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, “যারা অবৈধভাবে মাটি কাটছে, তথ্য-প্রমাণসহ আমাদের জানালে আমরা দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”