
তরিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
(২৬ নভেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত “কীটনাশকের ঝুঁকি মোকাবেলায় আইনের সঠিক প্রয়োগ” শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণ, পাশাপাশি কৃষিজমি সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে স্থানীয় কৃষক, কৃষিবিদ, কীটনাশক বাজারজাতকারী, বিপণনকারীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সকাল ১০:৩০টায় আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে সেমিনারটি আয়োজন করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আব্দুর রহিম।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেলার রিসার্চ, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন কো-অর্ডিনেটর রহমুনা নূরাইন। তার আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশর সামগ্রিক চিত্র। কৃষি নির্ভর এই দেশের শ্রমশক্তির ৪১ ভাগ এখনও কৃষিতে জড়িত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণা অনুযায়ী অকৃষি কাজের জন্য প্রতি বছর ০.৬৮৫ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমছে। আবার অতিরিক্ত উৎপাদন বৃদ্ধিও জন্য মাত্রাতিরিক্ত রসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে দিন দিন আমাদের কৃষিজমি গুলো অনুর্বর হয়ে পড়ছে। বিবিএস এর তথ্য মতে, ২০০০ সালে দেশে মাত্র ৮ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহৃত হতো, যা মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায়, ৪০ হাজার টনে। দেশে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত। এসব কীটনাশকের সব, কম—বেশি বিপজ্জনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আটটি মানদণ্ড অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত ২৫টি বালাইনাশক বিপজ্জনক হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
রাসায়নিক কীটনাশক শুধু পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করছে না, এর ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও মাটি, পানি, বাতাস দূষিত হচ্ছে। পোকামাকড় মরে যাবার কারণে হ্রাস পায় জীববৈচিত্র্য। সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। এর ফলে ক্যানসারসহ নানাবিধ রোগ দেখা যায়। এ ছাড়া পারকিনসন রোগ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক দুর্বলতা প্রভৃতিও হতে পারে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন ২০১৮, জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৮, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি ২০২০, জাতীয় জৈব কৃষি নীতি, ২০১৬ কীটনাশক ব্যবহারের নীতিমালা থাকলেও তা প্রতিপালিত হচ্ছেনা।
রাজশাহী, দিনাজপুর ও ফরিদপুরে গত তিন মাসে ধানক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়ে তিন জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। “এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি কৃষক হত্যা,” মন্তব্য করেন প্রাকৃতিক কৃষির সমন্বয়কারী দেলোয়ার জাহান তার মতে, কৃষক ও কৃষিকাজে সম্পৃক্তদের রোগবালাই বেড়ে চলেছে; সেইসঙ্গে এসব শস্য ভোক্তাদের মধ্যেও নানা রোগের প্রবণতা বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি শস্য ও সবজি চাষে কীটনাশক প্রয়োগের নির্দিষ্ট শিডিউল কৃষকদের বেশি বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে। ‘কীটনাশক’ শব্দের পরিবর্তে ‘কীটদূরীকরণ’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত, কারণ কীট-পতঙ্গ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আলোচনায় উঠে আসে, দেশি বীজ, বৈচিত্র্যময় চাষাবাদ, মিশ্র কৃষি পদ্ধতি এবং ব্যাঙ, পাখি, শকুনসহ প্রাকৃতিক কীটদুরীকরণকারীদের রক্ষা করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বারসিক পরিচালক পাভেল পার্থ মনে করেন, বাংলাদেশে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশ। তিনি বলেন, “সবুজ বিপ্লব পৃথিবীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এই যুক্তিতে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফসলকে প্রমোট করা হচ্ছে। বায়োক্রপসায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু সম্মেলনে অর্থায়নে যুক্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জৈব অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত।”
তিনি উল্লেখ করেন, এনডিসিতে প্রথমবারের মতো এগ্রোইকোলজির প্রতিশ্রুতি এসেছে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
সিনজেনটা বাংলাদেশের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তাহেরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পণ্যের লেবেল, সচেতনতামূলক প্রচারণা, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং স্প্রে প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে অডিও-ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে সচেতন করা হয়। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার রোধে নিরাপদ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।”
ইনতেফা কোম্পানির প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হানিফ উদ্দিন বলেন, “আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম মেনে ব্যবসা করি। কিন্তু বাজারে অনিবন্ধিত কোম্পানির কীটনাশক অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিক্রি হচ্ছে এটা বন্ধে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ক্যাব সভাপতি ও সাবেক সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, “১৮ কোটি মানুষই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার টাকার সমপরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, যা বিশাল অর্থনৈতিক বাজার তৈরি করেছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
প্রান্তিক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, “কীটনাশকের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে বিষমুক্ত কৃষিতে যেতে হলে কৃষকদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন উৎপাদন পদ্ধতি, আইন সম্পর্কে জ্ঞান এবং সামগ্রিক সচেতনতা, সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়াতে হবে।
প্রান্তিক কৃষক আবদুস সামাদ বলেন, “সচেতন হয়ে দেশি জাতের ধানসহ বিভিন্ন ফসল রোপণ করার চেষ্টা করি এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করি।”
গাজীপুরের কৃষক কামাল সরকার জানান, “বেসরকারিভাবে পাওয়া প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে না পারলেও আংশিকভাবে অনুসরণ করছি।”
বারির সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাজিমউদ্দিন বলেন, “কীটনাশক রেখে ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হলে আইনগতভাবে এগোতে হবে। ২০১২ সালের আইনের ২২(ক) ধারা অনুযায়ী হ্যান্ডলারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, কিন্তু তা বাস্তবে হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকায় কার্যকর মনিটরিং সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, “ডাক্তাররা যথাযথভাবে রোগের তথ্য ও পেশাগত রেকর্ড রাখেন না। অনেক কোম্পানি বিপজ্জনক (রেড ক্যাটাগরি) কীটনাশক ‘সবুজ মার্ক’ করে বিক্রি করছে। বৈশ্বিকভাবে নিষিদ্ধ বালাইনাশক যেমন গ্লাইফোসেট—বাংলাদেশে তা এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রানুলার পেস্টিসাইড কমলেও সার্বিক ব্যবহারের হার বাড়ছে।”
সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. আতাউর রহমান বলেন, “ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন ও কীটনাশক ব্যবহার কখনও কখনও জরুরি হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও তথ্য প্রচারে আরও মনোযোগ দিতে হবে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রভাতচন্দ্র বর্মণ বলেন, “কীটনাশকের মান, ডোজ ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে তিন ধরণের টেস্ট করা হয়। কৃষকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে ওয়েবসাইটে প্রতিনিধিরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত আছে।”
বারি’র কীটতত্ত্ব বিভাগের ড. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, “কীটনাশক রাতারাতি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ব্যবহার কমাতে নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং কৃষক পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবেশবান্ধব কীটনাশক দামি হওয়ায় কৃষকের নাগালের বাইরে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. সেকেন্দার ইসলাম জানান, “কীটনাশক সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ধীরে ধীরে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
প্রধান অতিথি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আব্দুর রহিম বলেন, “দেশের জন্মলগ্নেই ফলন বাড়ানোর তাড়না থেকে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছিল। এখন স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই কৃষিতে গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। জৈব ও অজৈব কৃষির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।”
তিনি যোগ করেন, “রাসায়নিক কীটনাশকের বিরুদ্ধে পোকামাকড়ের রেজিস্ট্যান্স বাড়ায় প্রয়োগের পরিমাণও বাড়ছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণের ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকায় মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগে সমস্যা হচ্ছে। কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে অ্যাপস কৃষকের ঠিকানা, কৃষকের জানালা, খামারী ব্যবহার করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বহুল জনসংখ্যার দেশে খাবারের যোগান দেওয়া কঠিন। লিজের ওপর কৃষিকাজ বাড়ায় চাষাবাদে চাপ তৈরি হচ্ছে। অসংগত মূল্য কাঠামো ও সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিজনাল ফসলকে বারোমাসী উৎপাদনের চাপে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ক্রপ ডাইভার্সিটিতে যেতে হবে।”
আলোচকরা মনে করেন, কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্যে নয়, মাটির উর্বরতা, জীববৈচিত্র্য এবং উৎপাদিত ফসলের গুণমানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়লে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময়ে সভাপতিত্ব করেন বেলার হেড অব প্রোগ্রামস ফিরোজুল ইসলাম মিলন এবং সঞ্চালক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এএমএম মামুন, প্রোগ্রাম ও ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর, বেলা।